ঢাকার রমনা কালী মন্দিরের সুউচ্চ চূড়া এক সময়ে ছিল জনবহুল ঢাকার শুকতারা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সেই মন্দিরই সাক্ষী ছিল ভয়ঙ্কর হত্যালীলার। ধ্বংস হয়েছিল বাংলাদেশের রমনা কালী মন্দির। তার পরে পদ্মা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। ফের মাথা তুলেছে ঢাকার কালীক্ষেত্র, রমনা কালী মন্দির।
সলিল চৌধুরী তাঁর গণসঙ্গীতে লিখেছিলেন, “ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি, এখানে থেমোনা।” কালী-কথার সঙ্গে এই গানের সরাসরি কোনও মিল নেই। তবে, পড়শি দেশের কালী-কথাতেও সে পংক্তি যেন অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। আসলে, কালীই তো স্বয়ং কাল। হিন্দু শাস্ত্রমতে, কালীই সংহার করেন। আবার তিনিই পথ দেখান, রক্ষা করেন। অন্ধকারের বুক চিরে আলোকবর্তিকার দিশারী স্বয়ং আদ্যাশক্তি। মালদহের হবিবপুরে সেই কালীর আরাধনা করেন মুসলিম নারী শেফালী বেওয়া। আবার, কাঁটাতারের ওপারে পদ্মাপাড়ে সেই কালীই ধ্বংসের বুক চিরে ফিরে আসা আলোর পথযাত্রী।
ইতিহাসের পাতায় এক অমরতীর্থ বাংলাদেশের ঢাকার রমনা কালী মন্দির। যে তীর্থের প্রতিটি ইটের ভাঁজে জড়িয়ে আছে বেদনা, আত্মত্যাগ আর ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। যে মন্দিরের সুউচ্চ চূড়া ছিল জনবহুল ঢাকার শুকতারা, সেই মন্দিরই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সাক্ষী ছিল ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞের। সে সময়ে ধ্বংস হয়েছিল বাংলাদেশের রমনা কালী মন্দির। তার পরে পদ্মা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। ফের মাথা তুলেছে ঢাকার কালীক্ষেত্র, রমনা কালী মন্দির।
ঢাকার রমনা এলাকায় সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের দক্ষিণে এই শতাব্দী প্রাচীন মন্দির। জনশ্রুতি বলে, প্রায় ৫০০ বছর আগে গোপালগিরি নামে এক সন্ন্যাসী এই জায়গায় একটি আখড়া তৈরি করেন। তারও ২০০ বছর পরে মূল রমনা কালীমন্দির নির্মাণ করেন হরিচরণ গিরি। তবে পরবর্তী সময়ে এই মন্দিরের প্রধান সংস্কার করেন ভাওয়ালের রানি বিলাসমণি দেবী।
১৯৭১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এই পবিত্র ভূমিতেই চলে ভয়ঙ্কর হত্যালীলা। ইতিহাসের পাতায় যা রমনা গণহত্যা নামেও পরিচিত। প্রায় এক ঘণ্টায় হত্যা করা হয়েছিল মন্দিরে আশ্রয় নেওয়া ১০০ জনকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও শতাব্দীপ্রাচীন এই মন্দির সংস্কারের জন্যে অপেক্ষা করতে হয় বহু দিন। অবশেষে ২০১৭ সালে মন্দির পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ শুরু। ভারত এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ আর্থিক সহায়তায় নতুন রূপে তৈরি হয় মন্দির। ২০২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকায় এসে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ নবনির্মিত রমনা কালী মন্দির ও সংস্কার করা অংশের উদ্বোধন করেন।
ঢাকার রমনা কালী মন্দির এক দিন দেখেছে ভয়ঙ্কর হত্যালীলা। আজ সেই কালীক্ষেত্রেই হয় মঙ্গলারতি, গোধূলিতে জ্বলে সন্ধ্যাপ্রদীপ। রমনা কালী মন্দির ইতিহাসের কাছে এক নীরব বার্তা। আজও যে মন্দিরের অলিন্দে অলিন্দে আলোর বার্তা। ফিরে আসার বার্তা। চরৈবেতির বার্তা।

ন্যাশনাল ডেস্ক । জনতার কন্ঠ.কম 


















