সার্বিয়ার দীর্ঘদিনের নেতা আলেকসান্দার ভুচিচ নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেছেন। রোববারের নির্বাচনে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন বড় জয় পেতে যাচ্ছে বলে প্রাথমিক ফলাফলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে ১২ বছরের ভুচিচ শাসনের অবসান ঘটতে পারে।
ভুচিচ নিজেই প্রাথমিক ফলাফলের কথা তুলে ধরে পরাজয় স্বীকার করেন। তিনি বলেন, এখনো চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়নি। তবে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ছাত্রদের তালিকা ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেতে পারে। তার দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি পেতে পারে ১০৫টি আসন।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা সিইএসআইডি-আইপিএসপিএসের নমুনাভিত্তিক হিসাবেও ছাত্রদের তালিকা ১৩৮টি আসন পেতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ভুচিচের ডানপন্থি দল পেতে পারে ১০৪টি আসন। বাকি আসনগুলো জাতিগত সংখ্যালঘুদের দলগুলোর মধ্যে ভাগ হতে পারে।
পরাজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানী বেলগ্রেডসহ বিভিন্ন শহরে আনন্দ-উল্লাস শুরু হয়। রাস্তায় নেমে মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে করমর্দন করে এবং গাড়ির হর্ন বাজিয়ে বিজয় উদ্যাপন করে। ছাত্রদের সদর দপ্তরে সমর্থকেরা ‘বিজয়, বিজয়’ স্লোগান দেন।
বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাদোমির সাইচিচ ছাত্রদের পক্ষ থেকে বলেন, ‘আজ রাতে জনগণের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। আজ আমরা বিজয় উদ্যাপন করছি, আগামীকাল ভবিষ্যৎ গড়ব।’
রোববারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও ছিল রেকর্ডসংখ্যক। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত পর্যবেক্ষক সংস্থা সিইএসআইডি ও ইপসোসের হিসাবে ভোট পড়েছে ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর দেশটিতে এটিই সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি বলে জানিয়েছে পর্যবেক্ষকেরা। ভোটকেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে; কোথাও কোথাও ভোট দিতে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।
এই নির্বাচনের পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ রেলস্টেশনে ছাদ ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা। নির্মাণকাজে অবহেলা, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলন সরকারবিরোধী বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
শিক্ষার্থীরা আন্দোলনকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে ২৫০ আসনের সংসদের জন্য ২৫০ জন প্রার্থীর তালিকা ঘোষণা করেন। এতে শিক্ষাবিদ, ক্রীড়াবিদ ও কৃষকরাও রয়েছেন। তাদের অঙ্গীকার—দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।
অন্যদিকে, ভুচিচের দল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সম্প্রচারমাধ্যমের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে নির্বাচনি প্রচার চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুচিচ আন্দোলনকারীদের বিদেশি শক্তির হাতিয়ার বলে আখ্যা দিলেও শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তারা গ্রামাঞ্চলেও প্রচার চালিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠাবিরোধী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেন। তাদের প্রচারের স্লোগান ছিল, ‘সার্বিয়া নাকি মাফিয়া?’
নির্বাচনের আগে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা কর্মীদের আটক, নজরদারি এবং সাইবার হামলার অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ভোটের দিনও ব্যালটের ছবি তোলা, ভোটারদের ওপর চাপ প্রয়োগ, ভোট কেনার চেষ্টা ও একাধিকবার ভোট দেওয়ার মতো অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা সিআরটিএর প্রতিনিধি রাসা নেদেলকভ বলেন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অনিয়ম নথিভুক্ত হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের বাইরেও সহিংস ঘটনার সংখ্যা বাড়ছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদপ্রত্যাশী সার্বিয়ার এই নির্বাচনকে ইউরোপজুড়ে গণতন্ত্রপন্থি শক্তি ও কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির মধ্যে চলমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ছাত্র আন্দোলনের এই সাফল্য ইউরোপের অন্যান্য দেশে তরুণদের সরকারবিরোধী আন্দোলনেও প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 
























