সিরাজগঞ্জ , বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo প্লাস্টিকের চেয়ারই চলাচলের একমাত্র সম্বল: চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছেন বৃদ্ধ হুরমুজ আলী Logo বন্যার অবনতি হতে পারে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে Logo সিরাজগঞ্জে এক সপ্তাহে ৪ শিশু ধর্ষণ-বলাৎকারের শিকার Logo ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৫৭ দিন পর ফ্লাইট চালু হলো Logo রায়গঞ্জে ভ্যানচালক জাহের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার দাবি Logo ব্রহ্মপুত্র নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু Logo কারণ দর্শানোর নোটিশ পেলেন বেলকুচি পৌরসভার সেই প্রকৌশলী Logo কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে ট্রাক–মাইক্রোবাস সংঘর্ষে শিশুসহ নিহত ৩, আহত ১১ Logo যুদ্ধবিরতি ভেঙে লেবাননে হামলা চালাল ইসরায়েল, ৮ জন নিহত Logo যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দ: সারাহ কুক

মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কি কোন পেশা?

  • রিপোর্টার
  • আপডেট টাইম : ১২:৫৭:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
  • 251

(চতুর্থ পর্ব: আশংকাজনকহারে বাড়ছে অপ-সাংবাদিকতা)

 

মহান পেশা বলা হলেও নানা কারণে সাংবাদিকতা পেশা মর্যাদা হারিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে মফস্বলের সাংবাদিকদের সম্মানের জায়গাটা আগের মতো আর নেই। দুই দশক আগে আমাদের পূর্বসূরীরা যে মর্যাদার সঙ্গে সাংবাদিকতা করেছেন, ইতিমধ্যে সেই সোনালী অধ্যায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

 

 

অনেকের দ্বি-মত থাকতে পারে তবে আমি মনে করি নিচের কয়েকটি কারণে মফস্বল সাংবাদিকতা মর্যাদাহীন হয়ে পড়ছে।

 

১. ছোট রাষ্ট্রে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত গণমাধ্যমের অনুমোদন।
২. এসব গণমাধ্যম থেকে বেতনহীন বা নামমাত্র সম্মানিতে জেলা-উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ।
৩. নিয়ন্ত্রণহীনভাবে শত শত অনুমোদনহীন ভুইফোঁড় গণমাধ্যমের আবির্ভাব এবং এসব গণমাধ্যমেও জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ।
৪. উপরের তিনটি কারণে ফৌজদারি অপরাধী, প্রতারকচক্র, মাদকাসক্ত, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজদের সাংবাদিকতায় আসার সহজলভ্যতা।
৫। অর্ধ-শিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত ব্যক্তি (অনেকে আছে নিজের নাম সঠিকভাবে লিখতে পারে না) অতি সহজেই সাংবাদিকতা পেশায় আসার সুযোগ।

 

পড়ুন: (তৃতীয় পর্ব: বাড়ছে গণমাধ্যম: কমছে মফস্বল সাংবাদিকদের জীবনমান)

বাংলাদেশের মতো একটি ছোট্ট রাষ্ট্রে ৫০টি টেলিভিশন, ১৫টি আইপি টিভির অনুমোদন রয়েছে। এছাড়া অনুমোদনহীন রয়েছে অসংখ্য আইপিটিভি। একটি জেলায় ৫০ জন স্যাটেলাইট টিভি, ১৫ জন আইপি টিভি প্রতিনিধি রয়েছে। আবার কোন কোন টেলিভিশনের উপজেলা পর্যায়েও প্রতিনিধি রয়েছে। আর প্রিন্ট এবং অনলাইন পত্রিকার জেলা উপজেলা প্রতিনিধি তো রয়েছেই।

ছবি: এআই দ্বারা তৈরিকৃত।

 

সব মিলিয়ে একটি জেলা সদরে কমপক্ষে তিনশো সাংবাদিকের সৃষ্টি হয়েছে-এক যুগ আগেও যার সংখ্যা পঞ্চাশের অধিক ছিল না। আর প্রতিটি উপজেলা, থানা পর্যায়েও সাংবাদিকের সংখ্যা কম নয়। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক মূলধারার সাংবাদিক থাকলেও বেশিরভাগই নামধারী। আর নামধারীরাই তৃণমূলে ছড়িয়ে দিচ্ছে অপ সাংবাদিকতা।

আরও পড়ুন: (দ্বিতীয় পর্ব: হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলেও নিজেদের খবর কেউ লেখে না)

 

অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই অপসাংবাদিকতা। মফস্বলে যার ছোঁয়া লেগেছে মারাত্বকভাবে। হাতে গোনা কয়েকজন দক্ষতা ও মেধা খাটিয়ে সংবাদ লিখলেও মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য সাংবাদিক। মেধা ও শ্রম দিয়ে কোন মুলধারার সাংবাদিক একটা সংবাদ লিখে তাঁর গণমাধ্যমে আপলোড হওয়ার মুহুর্তেই কপি-পেষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দাড়ি, কমা, সেমিকোলনও পরিবর্তণ করা হয় না।

 

 

মফস্বলে এমনও সাংবাদিক আছেন, তাকে কখনোই কোনদিনও সংবাদ লিখতে হয় নাই। অথচ মোটর সাইকেলের সামনে প্রেস স্টিকার লাগিয়ে জেলার এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। ওই সাংবাদিককে যদি জিজ্ঞেস করা যায়, আজকে আপনার জেলার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কি? বলতে পারবে না।

 

 

সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, অন্য সম্মানজনক পেশা ছেড়েও সাংবাদিকতায় আসছে অনেক যুবক। অপরাধচক্রের সাথে জড়িতরা পুলিশী হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হচ্ছে। আবার কেউ কেউ রয়েছে যার কোন কাজকর্ম বা চাকরি করার যোগ্যতা নেই-শেষ সম্বল সাংবাদিকতা। অবশ্য তারা লিখতে জানুক বা না জানুক অফিসগুলো কিছু টাকা নিয়ে একটি কার্ড ধরিয়ে দিয়ে মাঠে ছেড়ে দিচ্ছে। নেই কোন বেতন, নেই কোন সুযোগ সুবিধা। বাধ্য হয়ে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে এদেরকে।

 

আরও পড়ুন: মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কি কোন পেশা?

 

এই শ্রেণীর অপ সাংবাদিক যারা এক অক্ষর না লিখেও সাংবাদিক পরিচয়ে নিয়মিত চাঁদাবাজি করে চলছেন। আপনি সরকারি অফিসগুলোতে গেলেই দেখতে পারবেন এমন সংবাদিকের আনাগোনা।

 

 

ইউনিয়ন পরিষদ ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে প্রতিদিনই এদের ভীড় দেখা যায়। এদের মতো নামধারী সাংবাদিকের কারণে অতিষ্ঠ অফিসগুলোতে সাংবাদিক শব্দটার বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। যে কারণে মর্যাদা হারাচ্ছে এ পেশাটি।

 

 

সব মিলিয়ে অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে পেশাদারিত্বের সাংবাদিকতায় দুর্দিন চলছে বলে অনেকেই মনে করছেন। গণমাধ্যম বাড়লো, সাংবাদিকও বাড়লো। কিন্তু সাংবাদিকতা বা সাংবাদিকের উন্নয়ন কতটা হলো এ প্রশ্নটা কিন্তু এখনও রয়েই গেছে। (চলবে)

 

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, জনতার কণ্ঠ.কম এবং সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি দৈনিক কালবেলা ও বাংলানিউজ

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

প্লাস্টিকের চেয়ারই চলাচলের একমাত্র সম্বল: চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছেন বৃদ্ধ হুরমুজ আলী

মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কি কোন পেশা?

আপডেট টাইম : ১২:৫৭:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

(চতুর্থ পর্ব: আশংকাজনকহারে বাড়ছে অপ-সাংবাদিকতা)

 

মহান পেশা বলা হলেও নানা কারণে সাংবাদিকতা পেশা মর্যাদা হারিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে মফস্বলের সাংবাদিকদের সম্মানের জায়গাটা আগের মতো আর নেই। দুই দশক আগে আমাদের পূর্বসূরীরা যে মর্যাদার সঙ্গে সাংবাদিকতা করেছেন, ইতিমধ্যে সেই সোনালী অধ্যায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

 

 

অনেকের দ্বি-মত থাকতে পারে তবে আমি মনে করি নিচের কয়েকটি কারণে মফস্বল সাংবাদিকতা মর্যাদাহীন হয়ে পড়ছে।

 

১. ছোট রাষ্ট্রে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত গণমাধ্যমের অনুমোদন।
২. এসব গণমাধ্যম থেকে বেতনহীন বা নামমাত্র সম্মানিতে জেলা-উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ।
৩. নিয়ন্ত্রণহীনভাবে শত শত অনুমোদনহীন ভুইফোঁড় গণমাধ্যমের আবির্ভাব এবং এসব গণমাধ্যমেও জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ।
৪. উপরের তিনটি কারণে ফৌজদারি অপরাধী, প্রতারকচক্র, মাদকাসক্ত, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজদের সাংবাদিকতায় আসার সহজলভ্যতা।
৫। অর্ধ-শিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত ব্যক্তি (অনেকে আছে নিজের নাম সঠিকভাবে লিখতে পারে না) অতি সহজেই সাংবাদিকতা পেশায় আসার সুযোগ।

 

পড়ুন: (তৃতীয় পর্ব: বাড়ছে গণমাধ্যম: কমছে মফস্বল সাংবাদিকদের জীবনমান)

বাংলাদেশের মতো একটি ছোট্ট রাষ্ট্রে ৫০টি টেলিভিশন, ১৫টি আইপি টিভির অনুমোদন রয়েছে। এছাড়া অনুমোদনহীন রয়েছে অসংখ্য আইপিটিভি। একটি জেলায় ৫০ জন স্যাটেলাইট টিভি, ১৫ জন আইপি টিভি প্রতিনিধি রয়েছে। আবার কোন কোন টেলিভিশনের উপজেলা পর্যায়েও প্রতিনিধি রয়েছে। আর প্রিন্ট এবং অনলাইন পত্রিকার জেলা উপজেলা প্রতিনিধি তো রয়েছেই।

ছবি: এআই দ্বারা তৈরিকৃত।

 

সব মিলিয়ে একটি জেলা সদরে কমপক্ষে তিনশো সাংবাদিকের সৃষ্টি হয়েছে-এক যুগ আগেও যার সংখ্যা পঞ্চাশের অধিক ছিল না। আর প্রতিটি উপজেলা, থানা পর্যায়েও সাংবাদিকের সংখ্যা কম নয়। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক মূলধারার সাংবাদিক থাকলেও বেশিরভাগই নামধারী। আর নামধারীরাই তৃণমূলে ছড়িয়ে দিচ্ছে অপ সাংবাদিকতা।

আরও পড়ুন: (দ্বিতীয় পর্ব: হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলেও নিজেদের খবর কেউ লেখে না)

 

অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই অপসাংবাদিকতা। মফস্বলে যার ছোঁয়া লেগেছে মারাত্বকভাবে। হাতে গোনা কয়েকজন দক্ষতা ও মেধা খাটিয়ে সংবাদ লিখলেও মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য সাংবাদিক। মেধা ও শ্রম দিয়ে কোন মুলধারার সাংবাদিক একটা সংবাদ লিখে তাঁর গণমাধ্যমে আপলোড হওয়ার মুহুর্তেই কপি-পেষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দাড়ি, কমা, সেমিকোলনও পরিবর্তণ করা হয় না।

 

 

মফস্বলে এমনও সাংবাদিক আছেন, তাকে কখনোই কোনদিনও সংবাদ লিখতে হয় নাই। অথচ মোটর সাইকেলের সামনে প্রেস স্টিকার লাগিয়ে জেলার এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। ওই সাংবাদিককে যদি জিজ্ঞেস করা যায়, আজকে আপনার জেলার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কি? বলতে পারবে না।

 

 

সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, অন্য সম্মানজনক পেশা ছেড়েও সাংবাদিকতায় আসছে অনেক যুবক। অপরাধচক্রের সাথে জড়িতরা পুলিশী হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হচ্ছে। আবার কেউ কেউ রয়েছে যার কোন কাজকর্ম বা চাকরি করার যোগ্যতা নেই-শেষ সম্বল সাংবাদিকতা। অবশ্য তারা লিখতে জানুক বা না জানুক অফিসগুলো কিছু টাকা নিয়ে একটি কার্ড ধরিয়ে দিয়ে মাঠে ছেড়ে দিচ্ছে। নেই কোন বেতন, নেই কোন সুযোগ সুবিধা। বাধ্য হয়ে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে এদেরকে।

 

আরও পড়ুন: মফস্বল সাংবাদিকতা আদৌ কি কোন পেশা?

 

এই শ্রেণীর অপ সাংবাদিক যারা এক অক্ষর না লিখেও সাংবাদিক পরিচয়ে নিয়মিত চাঁদাবাজি করে চলছেন। আপনি সরকারি অফিসগুলোতে গেলেই দেখতে পারবেন এমন সংবাদিকের আনাগোনা।

 

 

ইউনিয়ন পরিষদ ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে প্রতিদিনই এদের ভীড় দেখা যায়। এদের মতো নামধারী সাংবাদিকের কারণে অতিষ্ঠ অফিসগুলোতে সাংবাদিক শব্দটার বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। যে কারণে মর্যাদা হারাচ্ছে এ পেশাটি।

 

 

সব মিলিয়ে অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে পেশাদারিত্বের সাংবাদিকতায় দুর্দিন চলছে বলে অনেকেই মনে করছেন। গণমাধ্যম বাড়লো, সাংবাদিকও বাড়লো। কিন্তু সাংবাদিকতা বা সাংবাদিকের উন্নয়ন কতটা হলো এ প্রশ্নটা কিন্তু এখনও রয়েই গেছে। (চলবে)

 

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, জনতার কণ্ঠ.কম এবং সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি দৈনিক কালবেলা ও বাংলানিউজ