ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে পণ্যের ট্রেসেবিলিটি। বৈশ্বিক বাজারে দিন দিন কঠোর হতে থাকা ট্রেস-অ্যান্ড-ট্র্যাক শর্তাবলি এবং পরিবেশগত ও সামাজিক কমপ্লায়েন্স পালনে এসব ঘাটতি বড় ধরনের বাণিজ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। পণ্য কোথায়, কীভাবে ও কাদের হাতে তৈরি হয়েছে, তার তথ্য সংরক্ষণ করতে না পারলে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ভবিষ্যতে বড় ধরনের বাধার মুখোমুখি হতে পারে। দেশের প্রধান প্রধান রপ্তানি খাতের সরবরাহ চেনে পণ্য ট্রেসেবিলিটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তথ্যগত ৬৬ ঘাটতি চিহ্নিত করেছে সরকার। এই সংকট মোকাবিলায় এবং রপ্তানি সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি সমন্বিত ‘জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম’ ও কৌশলপত্র প্রণয়নসহ ৬ দফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি অনুবিভাগ আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সভায় সরকারি-বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৭ সালের তৃতীয় বা চতুর্থ প্রান্তিকে ‘ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট’ (ডিপিপি) এবং ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে ‘ফোর্সড লেবার রেগুলেশন’ কার্যকর হবে। ইইউর ‘ক্যাচ’ ডিজিটাল সার্টিফাইড ব্যবস্থা (অনলাইনভিত্তিক ডিজিটাল প্রশংসাপত্র ও ট্র্যাকিং পদ্ধতি, যা সমুদ্রে অবৈধ বা অনিয়মিত মৎস্য শিকার রোধ করতে ব্যবহার করা হয়) ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি থেকেই চালু হয়েছে। ইইউ বনায়ন নীতি ২০২৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে বাধ্যতামূলক হচ্ছে। এ ছাড়া লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) আওতায় ২০২৮-৩০ সালের মধ্যে কসাইখানা পর্যায় পর্যন্ত ট্রেসেবিলিটি চালুর সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। এসব নীতিমালার আওতায় পণ্য রপ্তানিতে ডিজিটাল তথ্য থাকতে হয়। এর জন্য ট্রেসিবিলিটি গুরুত্বপূর্ণ। আর ট্রেসিবিলিটি নির্ধারণের জন্য তথ্য প্রয়োজন, যা এখন নেই। তাই ট্রেসিবিলিটির সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধানের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরবরাহ চেনে ট্রেসেবিলিটি বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার অবিচল। ট্রেসেবিলিটির প্রয়োজনীয়তা কেবল রপ্তানিতেই সীমাবদ্ধ নয়; অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা এবং পণ্যের হঠাৎ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানেও এটি প্রয়োগ করা হবে।
৬৬ ঘাটতি চিহ্নিত জানা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বিজনেস ইনিশিয়েটিভ ফর লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) এবং জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের (জিআইজেড) যৌথ সাসটেইনেবল ইন দ্য টেক্সটাইল সেক্টর (এসটিআইএলই-II) প্রকল্পের আওতায় একটি সার্বিক গ্যাপ এনালাইসিস বা তথ্যগত ঘাটতি মূল্যায়ন সমীক্ষা পরিচালিত হয়। সমীক্ষায় তৈরি পোশাক, চামড়া ও জুতা, কৃষি-খাদ্য এবং মৎস্য ও চিংড়ি খাতের সরবরাহ চেন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। সমীক্ষায় এসব খাতের রপ্তানিতে ৬৬টি ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়। সমীক্ষায় ‘ক্রিটিক্যাল প্রেফারেন্স স্কোরিং’ (সিপিএস) পদ্ধতির মাধ্যমে ৬৬টি ঘাটতির মধ্যে ৩৯টিকে অতি-গুরুত্বপূর্ণ বা কাঠামোগত সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ১৮টি ক্রিটিক্যাল বা আশু সংকট, যা আগামী ১৮ মাসের মধ্যে সমাধান করা প্রয়োজন। ১৩টি কাঠামোগত সংকট, যা ১৮ থেকে ৩৬ মাসের মধ্যে সমাধানযোগ্য। আর ৮টি কৌশলগত সংকট, যা ৩৬ থেকে ৬০ মাস মেয়াদে সমাধান করতে হবে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ১৪টি ঘাটতি চিহ্নিত হয়েছে কারিগরি ও ডেটা-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে (যার ৫টি অতি-গুরুত্বপূর্ণ)। নীতি ও প্রবিধান-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে ১৪টি (৪টি ক্রিটিক্যাল), প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশাসন বিষয়ে ১২টি (৩টি ক্রিটিক্যাল), খাতভিত্তিক কাঠামোয় ৯টি, শিল্পের সক্ষমতায় ৮টি এবং অর্থসংস্থানে ৭টি ঘাটতি পাওয়া গেছে।
সমীক্ষায় মূল দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে ডেটার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়, বরং বিভিন্ন সংস্থা ও কাস্টমস ব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান তথ্যের বিচ্ছিন্নতা ও ইন্টারঅপারেবিলিটির অভাব। আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে রপ্তানিকারকের উৎসের ডেটার সঙ্গে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের রিয়েল-টাইম কোনো সংযোগ নেই। এ ছাড়া পোশাকে ব্যবহৃত তুলার উৎসের স্পষ্ট তথ্য না থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘উইঘুর ফোর্সড লেবার প্রিভেনশন অ্যাক্ট’ (ইউএফএলপিএ) পালনে জটিলতা তৈরি হচ্ছে এবং দেশে পর্যাপ্ত ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় বিদেশি সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এই তথ্যগত ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ সামলাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে ‘সরবরাহ চেন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ: কার্যকারিতা টুল হিসেবে ট্রেসেবিলিটি’ শীর্ষক জাতীয় কর্মশালা আয়োজন করে। এতে সভাপতি ছিলেন তৎকালীন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান এবং প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সভায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ফ্লেক্সা, ফোয়াব, বিল্ড এবং বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি ও আইএলওর শীর্ষ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ও সমাধানের সুপারিশ করেন। পরে গত ১২ অক্টোবর কর্মশালার আলোচনার ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, উরমি গ্রুপ, এপিলিয়ন, ফতুল্লা অ্যাপারেলসের মতো একক কিছু প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট চালু করলেও বা চামড়া ও চিংড়ি খাতে বিচ্ছিন্ন পাইলট প্রকল্প থাকলেও জাতীয় কোনো সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম নেই। ফলে এই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে একটি আন্তঃকার্যক্ষম (ইন্টারঅপারেবল) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে।
সভায় তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান জানান, পোশাক খাত ইইউর ডিপিপি, সিএসডিডিডি ও ইএসপিআর-এর মতো কঠোর নীতিমালার মুখোমুখি রয়েছে। তাই জিআইজেড-এর সহায়তায় ৩০০টির বেশি কারখানায় আমাদের ইএসজি ও ডিপিপি পাইলটিং চলছে। বিচ্ছিন্ন ক্রেতা-চাহিদার বদলে পুরো খাতের জন্য বিজিএমইএকে ফোকাল পয়েন্ট ধরে একটি একক, মানসম্মত ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা উচিত। এ ছাড়া চামড়া ও জুতা খাতে আইএলও-এর সহায়তায় ২০টি কারখানায় পাইলটিং চলছে। একটি ‘জাতীয় আরবিসি সেল’ এবং জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সমাধানের জন্য গৃহীত ৬টি সিদ্ধান্ত
চিহ্নিত তথ্যগত ৬৬ ঘাটতি নিরসন এবং একটি আধুনিক জাতীয় কাঠামো দাঁড় করাতে কর্মশালায় সর্বসম্মতিক্রমে ৬টি মূল সিদ্ধান্ত ও এগুলো বাস্তবায়নের ফোকাল পারসন ঠিক করা হয়। সিদ্ধান্তগুলো হলো- স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ও ডেটা মানদণ্ড নির্ধারণ করে অতি দ্রুত ‘জাতীয় ট্রেসেবিলিটি কৌশলপত্র’ চূড়ান্ত করা হবে। এক্ষেত্রে ফোকাল পয়েন্ট থাকবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জিআইজেড ও বিল্ড; সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে কার্যক্রম তদারকিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ‘জাতীয় ট্রেসেবিলিটি স্টিয়ারিং কমিটি’ গঠন করা হবে।
ডেটা ভেরিফিকেশন, ইউনিক আইডেন্টিফায়ার এবং সব খাতকে এক ছাতার নিচে আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ইপিবি, জিআইজেড ও বিল্ডের যৌথ উদ্যোগে একটি ইন্টারঅপারেবল জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম (এনটিপি) তৈরি করা হবে; ট্রেসেবিলিটি ধারণার প্রচার ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রস্তুত করতে ব্যাপক সংলাপ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ; বিভিন্ন সমিতি ও প্রতিষ্ঠানের পৃথক ও বিচ্ছিন্ন ট্রেসেবিলিটি উদ্যোগ বা স্টাডিগুলোকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একক ছাতার নিচে এনে সমন্বিত করা হবে এবং দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনা এবং ট্রেসেবিলিটির জন্য গঠিত ‘পলিসি কো-অর্ডিনেশন ইউনিট’ (পিসিইউ) -কে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগ থেকে রপ্তানি অনুবিভাগে স্থানান্তর করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চিহ্নিত তথ্যগত ৬৬ ঘাটতি দূরীকরণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই ৬ দফা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য কেবল সুরক্ষিতই হবে না, বরং দেশীয় বাজারেও নিত্যপণ্যের সরবরাহে স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিল্ডর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, ২০২৫ সাল থেকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জিআইজেড-এর সাথে বিল্ড ট্রেসেবিলিটি নিয়ে কাজ করছে। দেশীয় ট্রেসেবিলিটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রথম ধাপে রপ্তানি ট্রেসেবিলিটিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি) চালু এবং জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম গঠন জরুরি।
জনতার কন্ঠ/এস এ

ন্যাশনাল ডেস্ক। জনতার কণ্ঠ.কম 




















