সিরাজগঞ্জ , শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

লংমার্চ না করে সংবিধান সংস্কারে আলোচনায় আসুন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

  • রিপোর্টার:
  • আপডেট টাইম : ০৮:৫৭:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
  • 8

বক্তব্য দিচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি : সংগৃহীত

সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজপথে লংমার্চ না করে আলোচনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, উচ্চকক্ষ গঠন করা হলে এর ক্ষমতা ও কার্যপরিধি কী হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। এ জন্য বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আলোচনায় আসতে হবে। লং মার্চ করে এসব বিষয়ে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

 

 

 

শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

 

 

 

 

উচ্চকক্ষের ক্ষমতা নির্ধারণের বিষয়টি তুলে ধরে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আলোচকরা বলে গেছেন উচ্চকক্ষ যদি পিআর পদ্ধতিতে হয়, তাহলে এর ক্ষমতা, কর্মপরিধি ও এখতিয়ার কী হবে, সেটা পরে নির্ধারণ করা যাবে। তবে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসতে হবে। যেখানে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া হয়েছে, সেই নোট অব ডিসেন্টগুলো শিথিল করতে হলে আলোচনা করতে হবে। সেটা লং মার্চে হবে না।’

তিনি বলেন, ‘আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে গঠন করা গেলে, সেই উচ্চকক্ষকে কী কী এখতিয়ার দেওয়া যাবে, তা আলোচনা করতে হবে। যদি সেটি অনির্বাচিত হয়, তাহলে নির্বাচিত সিনেটের মতো ক্ষমতা দেওয়া যাবে কি না, সেটিও আলোচনার বিষয়।’

উচ্চকক্ষের সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একটি প্রস্তাব আমার ভাই নজরুল সাহেব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাদের গাড়ি, বাড়ি বরাদ্দ, বেতন-ভাতা না দিলে ভালো হবে। আমি সম্পূর্ণ একমত।’

 

 

 

উচ্চকক্ষের মাধ্যমে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এসব বিষয়ে আলোচনায় আসতে হবে। নিম্নকক্ষে পাস হওয়া আইন পর্যালোচনা বা অনুমোদনের জন্য উচ্চকক্ষে পাঠানো হলে, কত দিন তারা সেটি নিজেদের কাছে রাখতে পারবেন এবং কত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। তা না হলে সংসদীয় ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় অসুবিধা হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে সাংবিধানিক সংশোধনী নিয়ে আলোচনা করতে হবে। উচ্চকক্ষে কোন কোন সংশোধনী যাবে, সেটা আমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে; যাবে। কিন্তু আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি এলে কত সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হবে, কত দিনের মধ্যে পাস হবে এবং কোন কোন সংশোধনী সেখানে যাবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।’

 

 

 

সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘একটি বিচার বিভাগীয় ধারণা আছে—বেসিক স্ট্রাকচার। এই বেসিক স্ট্রাকচার আসলে কী, সেটি নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। এ ধরনের কোনো ধারা বা সংশোধনী উচ্চকক্ষে গেলে কী হবে, তা বিস্তারিত আলোচনার বিষয়। আমি তো আলোচনা চেয়েছি।’

 

 

 

আদেশ দিয়ে সংবিধান পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা

সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধীদের দাবির প্রসঙ্গে বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তারা চাইলেন সংবিধান সংস্কার করতে হবে। আমার ভাই (আসিফ নজরুল) একটি আদেশ পাস করে দিয়েছিলেন। এখন কি তা অস্বীকার করব? সেই আদেশ পাস না করার জন্য আমি তখন অনুরোধ করেছিলাম। রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও কথা বলেছি। এভাবে আদেশ দিয়ে সংবিধানকে স্পর্শ করা যায় কি না, সেটি প্রশ্ন।’

তিনি বলেন, ‘সংবিধান প্রণীত হওয়ার আগে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং বিভিন্ন প্রেসিডেন্ট অর্ডারের মাধ্যমে অনেক কিছু হয়েছে। সেগুলো পরবর্তী সময়ে নোটিফিকেশন দেওয়া হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন।’

রাজনৈতিক সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হলে সবাই মিলে প্রতিশ্রুতি দিলে তখন আর আদেশ করতে হয় না। সমঝোতার দলিলে স্বাক্ষর হলে সেটি অঙ্গীকারে পরিণত হয়। যারা সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে, পরবর্তী সংসদে তাদের রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। সাধারণত এটাই রাজনৈতিক সমঝোতা।’

 

 

 

 

তিন জোটের সমঝোতা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার

তিন জোটের রাজনৈতিক সমঝোতা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তিন জোটের সমঝোতার অনেক কিছু লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে বলা হয়। তবে তিন জোটের বিষয়ে লিখিত কোনো দলিল আমরা এখনো পাইনি। সমঝোতার মধ্যে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ছিল, সেটি হয়েছে।’

বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি গণমাধ্যমের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল দেওয়া হলো। সরকারের হাতে একটি গণমাধ্যম থাকা যখন প্রয়োজন হলো, তখন তারা এটি করল। অন্তর্বর্তী সরকার কেন করে গেল না? বিটিভিকে স্বায়ত্তশাসন কেন দিয়ে গেল না? আগের সরকার কেন করেনি?’

তিনি বলেন, ‘এখন আর সেটার প্রয়োজন নেই, কারণ বেসরকারি চ্যানেল ও গণমাধ্যম রয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন, যাতে ভারসাম্য ও জবাবদিহি বজায় থাকে।’

রাজনৈতিক সমঝোতা বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বৃহত্তর অর্থে বলতে গেলে, রাজনৈতিক সমঝোতা বাস্তবে হয়েছে।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘প্রশ্ন করা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আপনারা মানলেন না কেন? এটা সমস্যা ছিল। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হলো, আমরা প্রথমে মানতে চাইনি। পরে এটি যখন জনদাবিতে পরিণত হলো, তখন আমরাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা মেনে নিয়েছি।’

 

 

 

ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার মধ্যে কি কেবল সাংবিধানিক সংশোধনীই? না। কেউ বলেছেন, ব্যক্তি প্রধান; কেউ বলেছেন প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি এবং আইন—সবকিছুই প্রধান।’

প্রতিষ্ঠান গঠনের পাশাপাশি ক্ষমতার প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করে দিতে হবে। তা না হলে সেই প্রতিষ্ঠানও স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ২০ বছর পরে আপনারা বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে একটা অভ্যুত্থান করবেন। আমরা সেদিন বেঁচে থাকব। এটা আমি তাদের ভবিষ্যদ্বাণী করেছি।’

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অনেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছেন। কেউ তো এর বিরোধিতা করছেন না। কিন্তু বিচারকদের স্বাধীনতার কথা বলার পাশাপাশি তাদের জবাবদিহি আছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।’

বিচারক নিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে উপস্থিত আলোচকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘যারা এখন বসে আছেন, তাদের মধ্যে ৩৫-৪০ জন রয়েছেন। আমার ভাই আসিফ নজরুল সাহেব বলেছেন, তার সবচেয়ে তিন নম্বর শ্রেণির ছাত্রটি কীভাবে বিচারক হয়েছেন, তা তিনি জানতে চেয়েছেন। তারা অনেকেই আছেন, যাদের অনেকে শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ বলেছেন।’

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অবশ্যই চাই এবং তা নিশ্চিত করব। যেটা অলরেডি এখন আছে। এখানে আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আমার ভাইও ছিলেন। আইন মন্ত্রণালয় কেবল পোস্ট অফিসের দায়িত্ব পালন করে ফাইল পাঠায়। এইটুকু ছাড়া বাকি সব সুপ্রিম কোর্টের হাতে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিচারকরা বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বাধীন। অন্য ক্ষেত্রের বিষয়টি সংবিধানে আছে। ১১৪ অথবা ১১৫ হতে পারে। ১১৬ তো হচ্ছে লোয়ার জুডিশিয়ারি। ওইটা হচ্ছে বিচারকার্য পরিচালনায় স্বাধীনতা।’

 

 

 

সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে সংসদ

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপনারা কি রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গের সার্বভৌমত্ব চান? চাইতে পারেন না। সার্বভৌমত্বের দুটি বিষয়—একটি জনগণ, আরেকটি দেশ।’

তিনি বলেন, ‘জনগণ সরাসরি তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ না করে নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভার সদস্যদের নির্বাচিত করেন। তারা আইনসভায় জনগণের সেই সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। সে কারণে বাস্তবিক অর্থে বলা হয়, পার্লামেন্ট সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে। অন্য অঙ্গগুলো নির্বাচিত নয়।’

 

 

 

জনতারকণ্ঠ/জেডএইচ

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লংমার্চ না করে সংবিধান সংস্কারে আলোচনায় আসুন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আপডেট টাইম : ০৮:৫৭:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজপথে লংমার্চ না করে আলোচনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, উচ্চকক্ষ গঠন করা হলে এর ক্ষমতা ও কার্যপরিধি কী হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। এ জন্য বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আলোচনায় আসতে হবে। লং মার্চ করে এসব বিষয়ে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

 

 

 

শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

 

 

 

 

উচ্চকক্ষের ক্ষমতা নির্ধারণের বিষয়টি তুলে ধরে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আলোচকরা বলে গেছেন উচ্চকক্ষ যদি পিআর পদ্ধতিতে হয়, তাহলে এর ক্ষমতা, কর্মপরিধি ও এখতিয়ার কী হবে, সেটা পরে নির্ধারণ করা যাবে। তবে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসতে হবে। যেখানে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া হয়েছে, সেই নোট অব ডিসেন্টগুলো শিথিল করতে হলে আলোচনা করতে হবে। সেটা লং মার্চে হবে না।’

তিনি বলেন, ‘আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে গঠন করা গেলে, সেই উচ্চকক্ষকে কী কী এখতিয়ার দেওয়া যাবে, তা আলোচনা করতে হবে। যদি সেটি অনির্বাচিত হয়, তাহলে নির্বাচিত সিনেটের মতো ক্ষমতা দেওয়া যাবে কি না, সেটিও আলোচনার বিষয়।’

উচ্চকক্ষের সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একটি প্রস্তাব আমার ভাই নজরুল সাহেব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাদের গাড়ি, বাড়ি বরাদ্দ, বেতন-ভাতা না দিলে ভালো হবে। আমি সম্পূর্ণ একমত।’

 

 

 

উচ্চকক্ষের মাধ্যমে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এসব বিষয়ে আলোচনায় আসতে হবে। নিম্নকক্ষে পাস হওয়া আইন পর্যালোচনা বা অনুমোদনের জন্য উচ্চকক্ষে পাঠানো হলে, কত দিন তারা সেটি নিজেদের কাছে রাখতে পারবেন এবং কত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। তা না হলে সংসদীয় ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় অসুবিধা হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে সাংবিধানিক সংশোধনী নিয়ে আলোচনা করতে হবে। উচ্চকক্ষে কোন কোন সংশোধনী যাবে, সেটা আমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে; যাবে। কিন্তু আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি এলে কত সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হবে, কত দিনের মধ্যে পাস হবে এবং কোন কোন সংশোধনী সেখানে যাবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।’

 

 

 

সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘একটি বিচার বিভাগীয় ধারণা আছে—বেসিক স্ট্রাকচার। এই বেসিক স্ট্রাকচার আসলে কী, সেটি নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। এ ধরনের কোনো ধারা বা সংশোধনী উচ্চকক্ষে গেলে কী হবে, তা বিস্তারিত আলোচনার বিষয়। আমি তো আলোচনা চেয়েছি।’

 

 

 

আদেশ দিয়ে সংবিধান পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা

সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধীদের দাবির প্রসঙ্গে বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তারা চাইলেন সংবিধান সংস্কার করতে হবে। আমার ভাই (আসিফ নজরুল) একটি আদেশ পাস করে দিয়েছিলেন। এখন কি তা অস্বীকার করব? সেই আদেশ পাস না করার জন্য আমি তখন অনুরোধ করেছিলাম। রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও কথা বলেছি। এভাবে আদেশ দিয়ে সংবিধানকে স্পর্শ করা যায় কি না, সেটি প্রশ্ন।’

তিনি বলেন, ‘সংবিধান প্রণীত হওয়ার আগে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং বিভিন্ন প্রেসিডেন্ট অর্ডারের মাধ্যমে অনেক কিছু হয়েছে। সেগুলো পরবর্তী সময়ে নোটিফিকেশন দেওয়া হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন।’

রাজনৈতিক সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হলে সবাই মিলে প্রতিশ্রুতি দিলে তখন আর আদেশ করতে হয় না। সমঝোতার দলিলে স্বাক্ষর হলে সেটি অঙ্গীকারে পরিণত হয়। যারা সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে, পরবর্তী সংসদে তাদের রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। সাধারণত এটাই রাজনৈতিক সমঝোতা।’

 

 

 

 

তিন জোটের সমঝোতা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার

তিন জোটের রাজনৈতিক সমঝোতা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তিন জোটের সমঝোতার অনেক কিছু লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে বলা হয়। তবে তিন জোটের বিষয়ে লিখিত কোনো দলিল আমরা এখনো পাইনি। সমঝোতার মধ্যে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ছিল, সেটি হয়েছে।’

বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি গণমাধ্যমের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল দেওয়া হলো। সরকারের হাতে একটি গণমাধ্যম থাকা যখন প্রয়োজন হলো, তখন তারা এটি করল। অন্তর্বর্তী সরকার কেন করে গেল না? বিটিভিকে স্বায়ত্তশাসন কেন দিয়ে গেল না? আগের সরকার কেন করেনি?’

তিনি বলেন, ‘এখন আর সেটার প্রয়োজন নেই, কারণ বেসরকারি চ্যানেল ও গণমাধ্যম রয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন, যাতে ভারসাম্য ও জবাবদিহি বজায় থাকে।’

রাজনৈতিক সমঝোতা বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বৃহত্তর অর্থে বলতে গেলে, রাজনৈতিক সমঝোতা বাস্তবে হয়েছে।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘প্রশ্ন করা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আপনারা মানলেন না কেন? এটা সমস্যা ছিল। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হলো, আমরা প্রথমে মানতে চাইনি। পরে এটি যখন জনদাবিতে পরিণত হলো, তখন আমরাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা মেনে নিয়েছি।’

 

 

 

ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার মধ্যে কি কেবল সাংবিধানিক সংশোধনীই? না। কেউ বলেছেন, ব্যক্তি প্রধান; কেউ বলেছেন প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি এবং আইন—সবকিছুই প্রধান।’

প্রতিষ্ঠান গঠনের পাশাপাশি ক্ষমতার প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করে দিতে হবে। তা না হলে সেই প্রতিষ্ঠানও স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ২০ বছর পরে আপনারা বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে একটা অভ্যুত্থান করবেন। আমরা সেদিন বেঁচে থাকব। এটা আমি তাদের ভবিষ্যদ্বাণী করেছি।’

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অনেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছেন। কেউ তো এর বিরোধিতা করছেন না। কিন্তু বিচারকদের স্বাধীনতার কথা বলার পাশাপাশি তাদের জবাবদিহি আছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।’

বিচারক নিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে উপস্থিত আলোচকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘যারা এখন বসে আছেন, তাদের মধ্যে ৩৫-৪০ জন রয়েছেন। আমার ভাই আসিফ নজরুল সাহেব বলেছেন, তার সবচেয়ে তিন নম্বর শ্রেণির ছাত্রটি কীভাবে বিচারক হয়েছেন, তা তিনি জানতে চেয়েছেন। তারা অনেকেই আছেন, যাদের অনেকে শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ বলেছেন।’

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অবশ্যই চাই এবং তা নিশ্চিত করব। যেটা অলরেডি এখন আছে। এখানে আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আমার ভাইও ছিলেন। আইন মন্ত্রণালয় কেবল পোস্ট অফিসের দায়িত্ব পালন করে ফাইল পাঠায়। এইটুকু ছাড়া বাকি সব সুপ্রিম কোর্টের হাতে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিচারকরা বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বাধীন। অন্য ক্ষেত্রের বিষয়টি সংবিধানে আছে। ১১৪ অথবা ১১৫ হতে পারে। ১১৬ তো হচ্ছে লোয়ার জুডিশিয়ারি। ওইটা হচ্ছে বিচারকার্য পরিচালনায় স্বাধীনতা।’

 

 

 

সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে সংসদ

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপনারা কি রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গের সার্বভৌমত্ব চান? চাইতে পারেন না। সার্বভৌমত্বের দুটি বিষয়—একটি জনগণ, আরেকটি দেশ।’

তিনি বলেন, ‘জনগণ সরাসরি তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ না করে নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভার সদস্যদের নির্বাচিত করেন। তারা আইনসভায় জনগণের সেই সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। সে কারণে বাস্তবিক অর্থে বলা হয়, পার্লামেন্ট সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে। অন্য অঙ্গগুলো নির্বাচিত নয়।’

 

 

 

জনতারকণ্ঠ/জেডএইচ