সিরাজগঞ্জ , শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

১৪ বছর পর পড়াশোনায় ফিরে সাফল্যে উপহাসের জবাব রীতির

ত্রিশ বছর বয়সী গৃহবধূ রীতি খাতুন। সম্প্রতি এইচএসসিতে জিপিএ-৫.০০ অর্জনকারী। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেশীরা আমাকে দেখে হাসত, উপহাস করত। বলত, এই বয়সে আবার কলেজে ভর্তি হয়েছে! টাকা নষ্ট করে লাভ কী? আমি শুধু শুনতাম। মনে মনে ভাবতাম, আজ যারা আমাকে নিয়ে উপহাস করছে, কাল যেন তারাই আমাকে নিয়ে প্রশংসা করে। সেই চিন্তা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। গভীর রাতে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে, কখনো লাইট জ্বালিয়ে পড়াশোনা করেছি।

 

 

 

 

কথাগুলো বলছিলেন, ত্রিশ বছর বয়সী গৃহবধূ রীতি খাতুন। সংসার, সন্তান ও পরিবারের নানা দায়িত্ব সামলে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও পড়াশোনায় ফিরেছিলেন তিনি। সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফলও হাতেনাতে পেয়েছেন। ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা (বিএম) শাখা থেকে জিপিএ-৫.০০ অর্জন করেছেন তিনি।

 

 

 

রীতি খাতুন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার নসিরপুর গ্রামের আব্দুল আলিম মন্ডল বাবুর স্ত্রী। তিনি ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিএম শাখা থেকে এবারের পরীক্ষায় অংশ নেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রীতি খাতুন ২০১০ সালে মোলামগাড়িহাট দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপরের বছরই পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়। এরপর দীর্ঘ সময় সংসার ও সন্তান লালনপালনে ব্যস্ত কেটে যায়। বর্তমানে তার ১১ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। কিন্তু মনের কোণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুপ্ত বাসনা ঠিকই বেঁচে ছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এসএসসি পাসের প্রায় ১৪ বছর পর, ২০২৪ সালে স্বামীর উৎসাহে আবারও কলেজে ভর্তি হন তিনি।

তবে নতুন করে এই পথ চলা সহজ ছিল না। দিনের বেলা সংসারের রান্নাবান্না ও কাজ সামলে রাতের বেলায় পড়াশোনার জন্য সময় বের করতে হয়েছে তাকে। এ সময় প্রতিবেশীদের নানা কটূকথা ও উপহাস শুনতে হলেও তিনি দমে যাননি। বরং ভালো ফল করার জেদ নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। এই দীর্ঘ পথচলায় তার স্বামী ও শিক্ষকরা সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা জুগিয়েছেন।

 

 

 

সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করে রীতি খাতুন বলেন, আমার স্বামীর সহযোগিতা ছিল বলেই এই বয়সে এসে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছি। তার অনুপ্রেরণা আমাকে পদে পদে সাহস জুগিয়েছে। গভীর রাতে লাইট জ্বালিয়ে, কখনো মোবাইলের আলোয় পড়াশোনা করতে হয়েছে। আমার এই ফলাফলের পেছনে শিক্ষকদেরও অনেক অবদান রয়েছে। আগামীতে যেন আরও ভালো কিছু করতে পারি, সে জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।

রীতির স্বামী আব্দুল আলিম মন্ডল বাবু বলেন, স্ত্রীর পড়াশোনার তীব্র আগ্রহ দেখে তাকে সাহস জুগিয়ে কলেজে ভর্তি করাই। সংসারের কাজের ফাঁকে সে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পড়াশোনা করেছে। তার এমন ফলাফলে পরিবারের সবাই আজ আনন্দিত ও গর্বিত।

 

 

 

 

রীতির শ্বশুর সাইদুর রহমান বলেন, আমার ছেলের বউয়ের এমন ফলাফলে আমরা পরিবারের সবাই অনেক খুশি। সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সে যে চমৎকার ফল করেছে, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের।

 

 

 

 

পাড়াপ্রতিবেশীদের মধ্যেও বইছে আনন্দের বন্যা। প্রতিবেশী আবু নাছের মন্ডল বলেন, ‘আমাদের গ্রামের বউ রীতি খাতুন দীর্ঘ চৌদ্দ-পনেরো বছর পর পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তার এমন সাফল্যে গ্রামের সবাই আনন্দিত। আমরা চাই, এই আনন্দ সবাই মিলে উদযাপন করতে। প্রয়োজনে চাঁদা তুলে খাসি জবাই করে খাওয়া-দাওয়া করব।’

 

 

 

 

ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সায়ফুল ইসলাম বলেন, ‘সংসারের নানামুখী দায়িত্ব সামলে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে রীতি খাতুন যে ফলাফল করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার এই কঠোর অধ্যবসায় ও শিক্ষার প্রতি অদম্য আগ্রহ অন্যদের জন্যও এক অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’

 

 

 

জনতারকণ্ঠ/জেডএইচ

কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার তথ্য গুলো সংরক্ষণ করে রাখুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

১৪ বছর পর পড়াশোনায় ফিরে সাফল্যে উপহাসের জবাব রীতির

আপডেট টাইম : ০৯:০৯:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

প্রতিবেশীরা আমাকে দেখে হাসত, উপহাস করত। বলত, এই বয়সে আবার কলেজে ভর্তি হয়েছে! টাকা নষ্ট করে লাভ কী? আমি শুধু শুনতাম। মনে মনে ভাবতাম, আজ যারা আমাকে নিয়ে উপহাস করছে, কাল যেন তারাই আমাকে নিয়ে প্রশংসা করে। সেই চিন্তা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। গভীর রাতে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে, কখনো লাইট জ্বালিয়ে পড়াশোনা করেছি।

 

 

 

 

কথাগুলো বলছিলেন, ত্রিশ বছর বয়সী গৃহবধূ রীতি খাতুন। সংসার, সন্তান ও পরিবারের নানা দায়িত্ব সামলে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও পড়াশোনায় ফিরেছিলেন তিনি। সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফলও হাতেনাতে পেয়েছেন। ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা (বিএম) শাখা থেকে জিপিএ-৫.০০ অর্জন করেছেন তিনি।

 

 

 

রীতি খাতুন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার নসিরপুর গ্রামের আব্দুল আলিম মন্ডল বাবুর স্ত্রী। তিনি ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিএম শাখা থেকে এবারের পরীক্ষায় অংশ নেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রীতি খাতুন ২০১০ সালে মোলামগাড়িহাট দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপরের বছরই পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়। এরপর দীর্ঘ সময় সংসার ও সন্তান লালনপালনে ব্যস্ত কেটে যায়। বর্তমানে তার ১১ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। কিন্তু মনের কোণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুপ্ত বাসনা ঠিকই বেঁচে ছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এসএসসি পাসের প্রায় ১৪ বছর পর, ২০২৪ সালে স্বামীর উৎসাহে আবারও কলেজে ভর্তি হন তিনি।

তবে নতুন করে এই পথ চলা সহজ ছিল না। দিনের বেলা সংসারের রান্নাবান্না ও কাজ সামলে রাতের বেলায় পড়াশোনার জন্য সময় বের করতে হয়েছে তাকে। এ সময় প্রতিবেশীদের নানা কটূকথা ও উপহাস শুনতে হলেও তিনি দমে যাননি। বরং ভালো ফল করার জেদ নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। এই দীর্ঘ পথচলায় তার স্বামী ও শিক্ষকরা সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা জুগিয়েছেন।

 

 

 

সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করে রীতি খাতুন বলেন, আমার স্বামীর সহযোগিতা ছিল বলেই এই বয়সে এসে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছি। তার অনুপ্রেরণা আমাকে পদে পদে সাহস জুগিয়েছে। গভীর রাতে লাইট জ্বালিয়ে, কখনো মোবাইলের আলোয় পড়াশোনা করতে হয়েছে। আমার এই ফলাফলের পেছনে শিক্ষকদেরও অনেক অবদান রয়েছে। আগামীতে যেন আরও ভালো কিছু করতে পারি, সে জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।

রীতির স্বামী আব্দুল আলিম মন্ডল বাবু বলেন, স্ত্রীর পড়াশোনার তীব্র আগ্রহ দেখে তাকে সাহস জুগিয়ে কলেজে ভর্তি করাই। সংসারের কাজের ফাঁকে সে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পড়াশোনা করেছে। তার এমন ফলাফলে পরিবারের সবাই আজ আনন্দিত ও গর্বিত।

 

 

 

 

রীতির শ্বশুর সাইদুর রহমান বলেন, আমার ছেলের বউয়ের এমন ফলাফলে আমরা পরিবারের সবাই অনেক খুশি। সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সে যে চমৎকার ফল করেছে, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের।

 

 

 

 

পাড়াপ্রতিবেশীদের মধ্যেও বইছে আনন্দের বন্যা। প্রতিবেশী আবু নাছের মন্ডল বলেন, ‘আমাদের গ্রামের বউ রীতি খাতুন দীর্ঘ চৌদ্দ-পনেরো বছর পর পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তার এমন সাফল্যে গ্রামের সবাই আনন্দিত। আমরা চাই, এই আনন্দ সবাই মিলে উদযাপন করতে। প্রয়োজনে চাঁদা তুলে খাসি জবাই করে খাওয়া-দাওয়া করব।’

 

 

 

 

ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সায়ফুল ইসলাম বলেন, ‘সংসারের নানামুখী দায়িত্ব সামলে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে রীতি খাতুন যে ফলাফল করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার এই কঠোর অধ্যবসায় ও শিক্ষার প্রতি অদম্য আগ্রহ অন্যদের জন্যও এক অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’

 

 

 

জনতারকণ্ঠ/জেডএইচ